দেখা করতে আসাতো দূরের কথা, সন্তানরা ফোনও দেয় না’

0
63

আমার দুই ছেলে। একজন একটি ফার্মে কাজ করে। আরেকজন কাজ করে ঢাকায় গার্মেন্টসে। যখন বয়স ছিল তখন দিনমজুরি কাজ করে ছেলেদের মানুষ করেছি। সেই ছেলেরাই এখন আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। ঈদের দিন একটা ফোনও দেয়নি।’ কথাগুলো বলতেই দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আবু বক্কর সিদ্দিকের। ৮০-এর কোঠায় তার বয়স। লাঠির সাহায্যে কোনোমতে চলাফেরা করতে পারেন। ছেলেদের লাঞ্ছনার শিকার হয়ে ঠাঁই হয়েছে দিনাজপুরের গোধূলী বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানেই পড়েছেন ঈদের নামাজ। চাপা কষ্ট নিয়ে আবু বক্কর সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে অনেক সুখে আছি। বাড়ি যাবার কোনো ইচ্ছা নাই। ছেলেপুলেকে আর চাই না। কেনইবা তাদের চাইবো? তারাতো আমাকে চায় না।’ এরপর একটু চুপ থেকে অভিমান ভুলে আবার বলেন, ‘ছেলে, ছেলের বউ সবাই ভালো থাকুক। দোয়া করি তাদের জন্য। আর যেন এমন কেউ না করে। সবাই তাদের বাবা-মাকে ভালোবাসুক, এটাই চাই আল্লাহর কাছে।’

শুধু আবু বক্কর সিদ্দিক নয়, তারমতো রহমত আলী, নফেস উদ্দিন, নমিতা গোস্বামী, সভা রাণীসহ প্রায় ১০০ জনের ঠিকনা এখন গোধূলী বৃদ্ধাশ্রম। যাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্পটা ভিন্ন। গোধূলী বৃদ্ধাশ্রম দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের রসুলপুর এলাকায় অবস্থিত। মঙ্গলবার (৩ মে) ঈদের দিন বৃদ্ধাশ্রমে প্রবেশ করতেই দেখা যায় কয়েকজন বৃদ্ধ পথচেয়ে বসে আছেন তাদের সন্তান-স্বজনরা দেখতে আসবেন সেই আশায়। কিন্তু পশ্চিম আকাশে গোধূলী বেলায় সূর্য অস্ত গেলেও কোনো সন্তান-স্বজন আসেনি তাদের খবর নিতে। গোধূলী বৃদ্ধাশ্রম সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় চেয়ারম্যান গোপাল দেব শর্মা ২০১৪ সালে নিজস্ব উদ্যোগে নিজ জমিতে বৃদ্ধাশ্রমটি নির্মাণ করেন। শুরুর দিকে এই আশ্রমে বৃদ্ধার সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা বেড়ে ১০০ ছুঁইছুঁই। ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আশ্রমে মারা গেছেন ৩৩ জন। তাদের মধ্যে অনেকের বয়স ছিল প্রায় শত বছর। প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের পাশাপাশি অন্যান্য চাহিদাও পূরণ করে আশ্রম কর্তৃপক্ষ। আশ্রমে মুসলমানদের পাশাপাশি থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও। তারা জানান, এখানে তারা ভালোই আছেন। নফেস উদ্দিন নামে আশি বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমার বাড়ি রসুলপুরে।

এই বৃদ্ধাশ্রম যখন হইছে, তখন থেকেই এখানে আছি। আজ থেকে ১২-১৪ বছর আগে ছেলে রসুলপুর ছেড়ে বীরগঞ্জ শহরে চলে গেছে। বউয়ের মাথায় সমস্যা ছিল। সে এখন তার বোনের বাড়ি থাকে। আমি একায় পড়ে গেলাম। আমাকে খাওয়াবে কে? তাই এখানে চলে আসছি। ঈদের জন্য এখান থেকে পাঞ্জাবি পাইছি, লুঙ্গি পাইছি। রোজার সময় সেহেরি খাওয়াইছে, ইফতার খাওয়াইছে। আর কী চাই বলেন?’ আজ ঈদের দিন, আপনার বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করে না বা কেউ নিতে আসে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ছেলেরা যদি খোঁজ না করে আমি কেমন করে যাই? তারা এলে না আমি তাদের বলবো। আজ ঈদের দিনও তারা আমার খোঁজ করেনি। বছর অন্তর একবার আসে ছেলে।’ বরিশাল থেকে এসেছেন সভা রাণী। প্রতিদিন পথ চেয়ে বসে থাকেন ঘরের দরজায়। আশা থাকে কেউ তাকে দেখতে আসবেন। তিনি বলেন, ‘একটা মেয়ে ছিল মারা গেছে। স্বামী নেই। মানুষের বাড়ি কাজ করতাম। যখন শরীরে জোর ছিল তখন কাজ করতাম, খাওয়া পেতাম, আদর পেতাম। এখন কাজ করতে পারি না। তাই তারা আর রাখেনি। এখানে দিয়ে গেছে।’ খুলনা থেকে আসা নমিতা গোস্বামী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংসারে দুই সতিনের ঘরে অশান্তি চাই না আমি। তাই চলে আসছি বৃদ্ধাশ্রমে।

আমার দেশের বাড়িতে ছেলে-পুলে সব আছে। আর কেন জানি বুঝি না বিয়ে দিলে ছেলেরা পর হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘এখানেই ভালো আছি। কোনো অশান্তি নেই। হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে আছি। ঈদ হোক দুর্গাপূজা হোক সবাই একসঙ্গে আনন্দ করি। অসুস্থ হলে চেয়ারম্যান সাহেব ডাক্তার দেখাচ্ছেন। আমার আর কিছু চাই না।’ কথা হয় গোধূলী বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক ও স্থানীয় চেয়ারম্যান গোপাল দেব শর্মার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর দেখি অনেক সন্তান তার বাবা-মাকে রাখে না। এই বিষয়টি দেখে বৃদ্ধাশ্রম করার চিন্তা আসে। প্রথমে পারিবারিক সহযোগিতায় বৃদ্ধাশ্রমটি করি। পরে স্থানীয় এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল ইমাম চৌধুরী এগিয়ে আসেন। তাদের সহযোগিতায় বৃদ্ধাশ্রমটি বেশ ভালো চলছে।’ স্থানীয় এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমটিতে যেহেতু মুসলিম-হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন রয়েছেন, তাই তারা যেন তাদের ধর্ম-কর্ম একসঙ্গে করতে পারেন সেজন্য একই ছাদের নিচে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির নির্মাণের পরিকল্পা নিয়েছে। খুব শিগগির এটি বাস্তবায়ন করা হবে।’